নেপালের বন্যায় অলৌকিকভাবে রক্ষা পেলেন তারা
বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ডেস্ক:
পাহাড়ি পথের বুক চিরে হঠাৎ নেমে আসা ধেয়ে আসা ঢল, পাথর আর কাদার হিংস্র স্রোত—মুহূর্তের মধ্যেই লন্ডভন্ড করে দিল সবকিছু। চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেল একের পর এক ভিটেমাটি। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। প্রকৃতির এই নির্মম তাণ্ডবে বহু পরিবার যখন দিশেহারা, তখন যুক্তরাজ্যে প্রবাসী ২৬ বছর বয়সী নেপালি যুবক বরুণ লামিছানের গল্পটি যেন সেই ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত ও করুণ দলিল।
কাজের সূত্রে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও বরুণের মন পড়ে থাকত নেপালের পাহাড়ি কোলে গড়ে ওঠা স্বজনদের ভিটায়। কিন্তু গত বুধবারের এক বিধ্বংসী রাত তাঁর জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বরুণ হারান তাঁর নিজের ভাই, চাচা এবং এক চাচাতো ভাইকে।
স্বজনদের চিরতরে হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ বরুণ বিবিসিকে জানান, এই শোকের গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। হঠাৎ আসা কাদাস্রোত আর পাহাড়ি ঢল তাঁদের সামলে ওঠার কোনো সুযোগই দেয়নি।
প্রকৃতির এই হিংস্র রূপের মধ্যেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন বরুণের মা, বাবা এবং বৃদ্ধা দাদি। তবে তাঁদের এই বেঁচে থাকার লড়াই ছিল রূপকথাকেও হার মানানো এক নির্মম বাস্তবতা।
স্রোতের তোড় আর ধসে পড়া মাটির থেকে বাঁচতে উঁচু পাহাড়ি ঢালের দিকে ছোটেন তাঁরা। কোনোমতে জীবন বাঁচাতে বয়োবৃদ্ধ দাদিসহ বরুণের মা-বাবাকে ‘শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে’ উঁচুতে উঠতে হয়েছিল। পিছলা কাদা আর পাথরের ওপর ভর করে কেবল প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সে রাতে তাঁরা একেকটি ইঞ্চি অতিক্রম করেন।
বরুণ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "সৌভাগ্যবশত তাঁরা বেঁচে আছেন।" কিন্তু মা-বাবাকে ফিরে পাওয়ার স্বস্তির সাথেই জড়িয়ে আছে কনিষ্ঠ ভাই ও স্বজনদের না পাওয়ার এক বুকভাঙা হাহাকার।
নেপালে প্রকৃতির তান্ডব ও নিখোঁজের ট্র্যাজেডি
সামাজিক মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বন্যার ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, নদীর উপচে পড়া পানি কীভাবে গ্রামের পর গ্রাম ধুয়েমুছে নিয়ে গেছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসা কাদাস্রোত ঢেকে ফেলেছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও অবকাঠামো। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং মৃতের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
বরুণ লামিছানের পরিবারের এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; এটি বর্তমানে দুর্যোগকবলিত নেপালের হাজারো পরিবারের নির্মম বাস্তবতা। প্রবাসে বসে বরুণের মতো অনেক তরুণই আজ দূর থেকে শুনছেন স্বজন হারানোর আর্তনাদ, আবার কেউ বা প্রিয়জনের কোনো খোঁজ না পেয়ে পার করছেন চরম উদ্বেগের প্রহর।
নেপালের পাহাড়ি ঢালে বরুণের মা, বাবা আর দাদির হামাগুড়ি দিয়ে বেঁচে ফেরার লড়াই যেমন জীবনের চরম জয়ের প্রতীক, তেমনই তাঁদের রেখে আসা তিন স্বজনের রক্তেভেজা কাদা নেপালের এই আকস্মিক বন্যার ভয়াবহতাকে ইতিহাসের পাতায় এক গভীর ক্ষত হিসেবে খোদাই করে দিল।
মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজনীয় ঘরগুলো * চিহ্নিত।